গণশুনানীর আগেই এলপি গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে ডিলাররা

প্রকাশিত: ৮:২১ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৩, ২০২১

গণশুনানীর আগেই এলপি গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে ডিলাররা

# প্রতি বোতল ১ থেকে দেড় হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে
# বিইআরসির শুনানী ১৪ জানুয়ারি শুরু
# ৫৬ ভাগ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে লোয়াব
স্টাফ রিপোর্টার : আদালতের নির্দেশে লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির মূল্যহার পুনর্র্নিধারণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। উদ্যোগের অংশ হিসাবে আগামী ১৪, ১৭ ও ১৮ জানুয়ারি সরকারি ও বেসরকারি বিপণন প্রতিষ্ঠান, ভোক্তা ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে দাম পুনঃনির্ধারণের বিষয়ে গণশুনানি হবে। শুনানিতে পাওয়া যুক্তিতর্ক ও তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে সিলিন্ডারজাত এই জ্বালানি গ্যাসের দাম।
তবে বিইআরসির শুনানীর আগেই দেশের বিভিন্ন স্থানে বেড়েছে এলপি গ্যাসের দাম। বোতল ভেদে অনেক স্থানে  ২ থেকে ৩শ’ টাকা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন  ভুক্তভোগী গ্রাহকরা। এছাড়া আবাসিক খাতে আর গ্যাস সংযোগ না দেয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের খবরে নড়েচড়ে বসেছে এলপি গ্যাসের মাঠ পর্যায়ের গ্রাহকরা। দাম বাড়ানোর আগেই তারা গ্রাহকদের কাছে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছে।
সর্বশেষ ২০০৯ সালে সাড়ে ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৭০০ টাকা নির্ধারণ করে দেয় বিইআরসি। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারের এই গ্যাসের দাম কয়েক দফা কমলেও দেশে গণশুনানি করে দাম পুনঃনির্ধারণ করেনি বিইআরিসি।
এদিকে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)’র দাম নির্ধারণে গণশুনানি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আগামী ১৪, ১৭ ও ১৮ই জানুয়ারি এই শুনানি হবে।
দাম নির্ধারণে সরকারি কোম্পানি যে প্রস্তাব দিয়েছে তার থেকে ৫৬ ভাগ বেশি দাম নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে বেসরকারি কোম্পানি। সরকারি এলপি গ্যাস লিমিটেড এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলোর পক্ষে এলপিজি অপারেটর এসোসিয়েসন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) দাম নির্ধারণে আলাদা প্রস্তাব দিয়েছে।
সরকারি কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেড সাড়ে ১২ কোজি বোতল একশ’ টাকা বাড়িয়ে সাতশ’ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। আর এলপিজি অপারেটর এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) ৯ শতাংশ লাভ ধরে ১২ কেজি গ্যাসের দাম ভোক্তাপর্যায়ে এক হাজার ২৫৯ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। যা সরকারি কোম্পানির এলপি গ্যাসের চেয়ে ৫৬ ভাগ বেশি।
লোয়াব এর দেয়া তথ্য অনুযায়ি বন্দর পর্যন্ত ১২ কোজি এলপি আসতে খরচ হয় ৬৩০ টাকা। এর সাথে বোতলজাত, প্রশাসনিক খরচ, বিনিয়োগ চার্জ, মার্কেটিং, সরবরাহ খরচ মিলে হয় ৮৮৭ টাকা। এর সাথে ৯ শতাংশ লাভ। তার সাথে তিন দফা ভ্যাট, পরিবেশকের সরবরাহ খরচ ও পরিবেশকের লাভসহ মোট এক হাজার ২৫৯ টাকা।
তবে কোন কোম্পানিই দাম কেন বাড়ানো হবে তার বিস্তারিত বিবরণ দেয়নি। এলপি গ্যাস কোম্পানি তার প্রস্তাবে বলেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় একশ’ টাকা দাম বাড়ানো হোক। কিন্তু এই একশ’ টাকা কেন বাড়ানো হবে তার বিস্তারিত বিবরণ নেই। লোয়াব তাদের প্রস্তাবে কোথায় কতভ্যাট দেয়া হচ্ছে, কোথায় কত খরচ হতে পারে তার বিবরণ দিয়েছে। কিন্তু এলপি গ্যাসের প্রধান যে দুই উপাদন প্রোপেন এবং বুটেন তার মিশ্রণের আলাদা বিবরণ দেয়নি।
সৌদি চুক্তিমূল্য বা সিপি এর সাথে জাহাজ ভাড়া (লোডিং/আনলোডিং খরচ, বন্দর চার্জ, ইত্যাদি), বীমা, কর, শুল্ক ইত্যাদি যোগ করা হয়। এটা বন্দর পর্যন্ত মূল্য। বন্দরের পরে যোগ হয় মজুদ, বোতলজাতকরণ, পরিবহণ, বিতরণ ও বিপণন চার্জ। আর এই সব যোগ করেই হবে ভোক্তার দাম।
উচ্চ আদালতের ২৫শে আগষ্টের আদেশ বাস্তবায়ন করতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন-২০০৩ এর ধারা ৩৪ (৪) অনুযায়ী এলপি গ্যাসের দাম ঠিক করতে গণশুনানির নোটিশ দিয়েছে।
দেশে এখন বিইআরসি থেকে লাইসেন্স নেয়া এলপিজি কোম্পানি ২৭টি। এরমধ্যে ১৯ কোম্পানি বাজারজাত করছে। ডিলার আছে প্রায় ৩ হাজার। আর খুচরা বিক্রেতা প্রায় ৩৮ হাজার। আমদানি করে ১৫ কোম্পানি। আমদানি টার্মিনাল আছে ২০টি। বছরে আমদানি হয় প্রায় ১০ লাখ টন। দেশীয় উৎপাদন বছরে প্রায় ১৭ হাজার টন।
এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণে কোনো ফর্মুলা বা নিয়ম নেই। বেসরকারি উদ্যোক্তারা আমদানির ওপর নির্ভর করে যখন যে দাম নির্ধারণ করে ভোক্তারা সে দামে কিনতে বাধ্য হয়।
কিন্তু পর্যালোচনা করে দেখা গেছে পার্শ্ববর্তী দেশের চেয়ে আমাদের এখানে এলপিজির দাম বেশি। আমদানি পর্যায়ে নানা ত্রুটি, ব্যবস্থাপনা এবং বেশি মুনাফা দাম বেশির কারণ বলে অনেকেই মন্তব্য করেন।
সম্প্রতি বিইআরসি এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণের নিয়ম ঠিক করতে একটি প্রস্তাব জ্বালানি বিভাগে জমা দিয়েছে। সেখানে দাম নির্ধারণ নিয়মসহ কীভাবে খরচ কমানো যায় তার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। গণশুনানির সময় এসব বিষয়ও ঠিক হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিইআরসি’র একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
সৌদি আরবের বাজারমূল্যের সাথে মিল করে বাংলাদেশে এলপিজি’র দাম নির্ধারণ করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিমাসে এই দাম নির্ধারণ করার কথা বলা হয়েছে। সৌদি এরামকো প্রতিমাসে পরবর্তী মাসের জন্য দাম নির্ধারণ করে। সেই দামের সাথে মিল রেখেই এলপিজি’র দাম ঠিক হবে।
বর্তমানে সৌদি আরব এশিয়ায় এলপিজির অন্যতম বড় রপ্তানিকারক। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সৌদি এরামকো’র নির্ধারণ করা সৌদি চুক্তিমূল্য-সিপিকে সাধারণত এশিয়া অঞ্চলে অনুসরণ করা হয়। সৌদি এরামকো প্রতি মাসের শেষে পরবর্তী মাসের জন্য প্রোপেন এবং বুটেনের দাম ঘোষণা করে।
বাংলাদেশের আমদানিকারকরা মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ভারতভিত্তিক বিভিন্ন ব্যবসায়ীর মাধ্যমে এলপিজি আমদানি করে।
অন্যান্য পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের মত এলপিজির বাজারমূল্য অস্থিতিশীল। এজন্য সৌদি চুক্তিমূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ভোক্তাপর্যায়ে এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করতে বলেছিল বিইআরসি।
সৌদি আরামকো সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিটন প্রোপেনের দাম ঠিক করেছিল ৩৬৫ ডলার। আর বুটেন ৩৫৫ ডলার। গত এক বছর এই দাম প্রচুর উঠানামা করছে। এপ্রিলে এই দাম ছিল যথাক্রমে ২৪০ ও ২৫০ ডলার। অথচ গতবছর মে মাসে ছিল ৫২৫ ডলার।
ভারতের কলকাতায় প্রতি কেজি এলপির মূল্য ৫০ টাকা (ভতুর্কি ছাড়া)। এর মধ্যে সৌদি চুক্তিমূল্য প্রতি কেজি ৩০ টাকা, পরিবহণ খরচ প্রতি কেজি ৫ টাকা এবং মজুতকরণ, বোতলজাতকরণ, বিপণন ও বিতরণ প্রতি কেজি ১৫ টাকা। অন্যদিকে বাংলাদেশে সমুদ্র পথে পরিবহণ ব্যয় প্রতি কেজি ১০ থেকে ১২ টাকা। করসহ মজুতকরণ, বোতলজাতকরণ, বিপণন ও বিতরণ প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৩২ টাকা।
বাংলাদেশে গত একশ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৫ ডিগ্রি এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এলপিজি মিশ্রণে প্রোপেন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং বুটেন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিবেচনা করতে বলা হয়েছে।
ভোক্তাপর্যায়ে সারাদেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ¦ালানি তেলের মূল্য অভিন্ন। তবে জ¦ালানি তেলের স্থানভেদে ডিপো থেকে পরিবহন দূরত্বের কারণে সামান্য পার্থক্য হয়। এলপিজি’র মূল্যও সারাদেশে অভিন্ন করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এখন শুনানি শেষে বিইআরসি সারাদেশে এক দাম নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়ন করাতে পারলে জনগণ সুফল পাবে।
দেশে এলপিজি ব্যবহারকারী প্রায় ৩৮ লাখ। এলপিজি ব্যবহারের প্রায় ৮৪ শতাংশ গৃহস্থালি এবং ১৬ শতাংশ অন্যান্য। এলপিজির ৩৭ শতাংশ ঢাকায়, ১৮ শতাংশ চট্টগ্রামে, ১২ শতাংশ খুলনায়, ১২ শতাংশ রাজশাহীতে, ৮ শতাংশ রংপুরে, ৬ শতাংশ ময়মনসিংহে, ৪ শতাংশ বরিশালে এবং ৩ শতাংশ সিলেট বিভাগে ব্যবহার হয়।
বড় জাহাজে এলপিজি পরিবহন করলে খরচ কম হয়। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী ভারতের হলদিয়া ও ধামরা বন্দরে পরিবহন খরচ প্রতি টনে ৫০-৬০ ডলার। বাংলাদেশের এলপিজি পরিবহন করা হয় ছোট জাহাজে। ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টন করে। এতে পরিবহন খরচ হয় ১১০-১৩০ ডলার। এক সাথে বড় জাহাজে বেশি করে আমদানি করলে খরচ কম হবে। সবমিলে বিইআরসির এই উদ্যোগ দেরিতে হলেও ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করবে আশা সকলের।
এদিকে দেশে গ্যাসের সরবরাহ ক্রমাগত কমছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় খোলা বাজার (স্পট মার্কেট) থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) কেনা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে আমদানি করা এলএনজির দৈনিক সরবরাহ ৪০ কোটি ঘনফুটের নীচে নেমে এসেছে। পাশাপাশি দেশের ক্ষেত্রগুলো থেকেও উত্তোলন কমেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, খোলা বাজার থেকে এলএনজি কেনার টেকসই পদ্ধতি সম্পর্কে বিশদভাবে অবহিত না হয়েই গত সেপ্টেম্বর মাসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে দৈনিক ৪৫ থেকে ৫৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সমপরিমান এলএনজি খোলা বাজার থেকে কেনা হবে। অক্টোবর-নভেম্বরে দুইবার ওই পরিমান এলএনজি কেনাও হয়। তাতে প্রায় ৭০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছিল।
কিন্তু তারপরই আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজিসহ সব জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করে। এখন প্রতি ইউনিট (এক হাজার মিলিয়ন বা এক কোটি ঘনফুট) এলএনজির দাম উঠেছে ১২ মার্কিন ডলারে যা অক্টোবরে ছিল ৬ ডলারের কম। এই অবস্থায় খোলা বাজার থেকে এলএনজি কেনা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে জাতীয় গ্রিডে এলএনজির সরবরাহ কমতে থাকে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ই নভেম্বর জাতীয় গ্রিডে আমদানি করা এলএনজি থেকে গ্যাসের সরবরাহ ছিল ৫৩ কোটি ১২ লাখ ঘনফুট। ১লা ডিসেম্বর ছিল ৪৯ কোটি ৪৭ লাখ। ১৫ই ডিসেম্বর ছিল ৪৬ কোটি ১০ লাখ। ২৬শে ডিসেম্বর ছিল ৩৯ কোটি ৬৯ লাখ। গত ৫-৬ই জানুয়ারি তা আরও কমে হয়েছে ৩৯ কোটি ২৭ লাখ ঘনফুট।
অন্যদিকে, দেশের ক্ষেত্রগুলো থেকেও গত মাস দুয়েক গ্যাস উত্তোলন কমেছে। তিনটি দেশীয় কোম্পানির (বিজিএফসিএল, এসজিএফএল ও বাপেক্স) পরিচালনাধীন ক্ষেত্রগুলোতে চালু কূপের সংখ্যা মোট ৭০টি। এগুলোর মোট উত্তোলন ক্ষমতা দৈনিক ১১৪ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট। নভেম্বরের মধ্যভাগ থেকে গড় উত্তোলন হচ্ছে ৮৫ কোটি ঘনফুটেরও কম। গত ৫-৬ই জানুয়ারি এই ৭০টি কূপে গ্যাস উত্তোলন হয়েছে গড়ে ৮৪ কোটি ৪৮ লাখ ঘনফুট।