স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন আজ

প্রকাশিত: ১২:০২ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২২

স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন আজ

কাল থেকে চলবে যানবাহন

উচ্ছ্বাসে ভাসছে পদ্মাপাড়ের মানুষ

স্টাফ রিপোর্টার: দেশের ১৭ কোটি মানুষের স্বপ্নের পদ্মাসেতু উদ্বোধন আজ। বহুকাল থেকে দেখে আসা স্বপ্ন আজ রূপ নেবে বাস্তবে। দেশ বিদেশের কোটি কোটি মানুষের চোখ এখন পদ্মার দিকে।  ইতোমধ্যে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অভিনন্দন জানিয়েছে। স্বাধীনতার পর বাঙ্গালী জাতির জন্য অন্যতম স্মরণীয় দিন আজ।

 

সেতুর ওপর দিয়ে কয়েক মিনিটেই পাড়ি দেয়া যাবে প্রমত্তা পদ্মা। দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ এ সেতুর নির্মাণকাজ এরই মধ্যে শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। সেতুতে যান চলাচলের জন্য যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষাও শেষ হয়েছে। চলাচলের জন্য এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত পদ্মাসেতু। আজ শুধু উদ্বোধনের নির্ধারিত সময়টির অপেক্ষা মানুষের।

 

আজ শনিবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সেতুর উদ্বোধন করবেন। শেষ মুহূর্তে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঘিরে শুক্রবারও চলে বিশাল কর্মযজ্ঞ। সেতু উদ্বোধনের পর দুই প্রান্তে আয়োজিত সমাবেশে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সকালে পদ্মাসেতুর মাওয়া প্রান্তে এসে উপস্থিত হবেন তিনি। মাওয়া প্রান্তে সেতুর উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করে অংশ নেবেন সুধী সমাবেশে। এরপর সেখান থেকে সেতু পার হয়ে শিবচরের বাংলাবাজার ঘাটে আয়োজিত দলীয় জনসভায় অংশ নেবেন। পদ্মাসেতুর আদলেই তৈরি করা হয়েছে জনসভার মঞ্চ।

 

শিবচর উপজেলা আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, পদ্মাসেতুর উদ্বোধনের পর বাংলাবাজার ফেরিঘাট এলাকার জনসভায় যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এ জনসভাকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রায় ১৫ একর জমির ওপর ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সেখানে তৈরি করা হয়েছে ১৫০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৪০ ফুট প্রস্থের বিশাল মঞ্চ। নিরাপত্তার জন্য মঞ্চের ভেতরে ও বাইরে বসানো হয়েছে ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার। থাকবে দেড় শতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা।

 

সভাস্থলে ৫০০ অস্থায়ী শৌচাগার, ভিআইপিদের জন্য আরো ২২টি শৌচাগার, সুপেয় পানির লাইন, ৪০ শয্যার তিনটি অস্থায়ী হাসপাতাল, নারীদের বসার আলাদা ব্যবস্থা এবং প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার আয়তনের সভাস্থলে দূরের শ্রোতাদের জন্য ২৬টি এলইডি মনিটর ও ৫০০ মাইকের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া নদীপথে আসা দর্শনার্থীদের জন্য ২০টি পন্টুন তৈরি করা হচ্ছে। এদিকে শিবচর উপজেলা থেকে লাখ-লাখ লোক সমাগমের চেষ্টা করছেন সরকারি দলের নেতারা। তাই চলছে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে দলীয় বৈঠক, আলোচনা সভা, মিছিল, গণসংযোগ ও মাইকিং।

 

সাধারণ জনগণ চায় সব ধরনের সংঘাত এড়িয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে পদ্মাসেতুর উদ্বোধন দেখতে। পদ্মাসেতু উদ্বোধন উচ্ছ্বাসে ভাসছে পদ্মাপাড়ের মানুষ থেকে শুরু করে দক্ষিণের ২১ জেলার মানুষ। পথে-ঘাটে, চায়ের কাপে, আড্ডায়-আলোচনায় সেই আনন্দেরই অনুরণন। চোখে-মুখে স্বপ্নপূরণের আলোকছটা।

 

প্রাণের সে উৎসবের ছটা পড়েছে সবখানে। সড়ক-মহাসড়ক, রাস্তাঘাট, হাটবাজার ও অলিগলি ছেয়ে গেছে পোস্টার, ব্যানার, বিলবোর্ড আর তোরণে। যতদূর চোখ যায় যেন রঙের ছড়াছড়ি। বিভিন্ন স্থানে করা হয়েছে আলোকসজ্জা। মরিচবাতিতে উজ্জ্বল সেতু, নৌকা।

 

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে জনসভায় দশ লাখ মানুষের সমাগম হবে। পানি থেকে শুরু করে তাদের সব ধরনের সুবিধা দিতে আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি। এছাড়া সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’

 

জানা গেছে, সব বাধা, সব মিথ্যা অভিযোগ, দেশী-বিদেশী শক্তির সব অসহযোগিতা একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বিশ্বকে দেখিয়ে দেয়া এক আত্মবিশ্বাসের নাম ‘পদ্মা সেতু’। আজ শনিবার থেকে কোটি কোটি মানুষ বলতে পারবে, আমাদের স্বপ্ন বাস্তাবায়ন হয়। আমরা পারি। সেতু উদ্ভোধনের পর বহু আলোচিত, বহু প্রতীক্ষিত, বহু প্রতিবন্ধকতা পেরোনো এ সেতুর মাধ্যমে ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯টি জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হচ্ছে। এর ফলে দেশের ৩ কোটির বেশি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবে।

 

দেশে এ পর্যন্ত কোনো স্বীকৃত ‘আইকনিক’ অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। পদ্মা সেতু একটি সেরা আইকন; এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পরিচিতি বিশ্বদরবারে বিকশিত হবে। শতাব্দীর পর শতাব্দী পদ্মা সেতু টিকে থাকবে নতুন নতুন প্রজন্মের মাঝে সাহসের প্রতীক হয়ে। কারণ সব উজিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হলো সক্ষমতার সারথি পদ্মা সেতু।

 

এদিকে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে উৎসবমুখর পরিবেশ গোটা দেশে। পদ্মার দুই পার সেজেছে বর্ণিল সাজে। তৈরি করা হয়েছে মুগ্ধকর মঞ্চ। সুধী সমাবেশ, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সর্বত্র বাজছে আনন্দের ঢোল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমে মাওয়া ও পরে জাজিরা প্রান্তে সেতুর উদ্বোধন করবেন আজ শনিবার। মূল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফলক উন্মোচনস্থলে ব্যানারসহ বেলুন ওড়ানো হবে। সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহীসহ কয়েকটি বিভাগীয় সদরে আতশবাজি উৎসব হবে। ঢাকার হাতিরঝিল, মুন্সীগঞ্জ, খুলনা, বরিশাল, গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে লেজার শো হবে। এ ছাড়া জেলায় জেলায় বিভিন্ন আয়োজন রয়েছে।

 

এদিকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে সেতু বিভাগ। জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, সাবেক রাষ্ট্রপতিগণ, মন্ত্রিসভার সদস্য, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির মেয়র, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশ ও মিশনের কূটনীতিক, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সাড়ে তিন হাজার অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ কার্ড দিয়েছে সেতু বিভাগ। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন পেশাজীবীদেরও দাওয়াত দেয়া হয়েছে।

 

জানা গেছে, পদ্মা পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম খরস্রোতা নদী। আমাজনের পরেই পদ্মা নদীর অবস্থান। ভারতের উত্তর ও উত্তর-পূর্ব অঞ্চলসহ চীন থেকেও পানিপ্রবাহ এই নদীতে এসে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। পদ্মার মতো প্রমত্ত খরস্রোতা নদীতে সেতু নির্মাণ সম্ভব- এ আত্মবিশ্বাসই ছিল না অনেকের। মালয়েশিয়ার বিনিয়োগকারীরা পদ্মা নদী দেখার পর সেতু নির্মাণ সম্ভব নয়- এমন মতামত দিয়ে কেটে পড়েছিল। কিন্তু বৈরী প্রকৃতির সঙ্গে কারিগরি ও প্রকৌশল দক্ষতায় তিলে তিলে তৈরি হয়েছে পদ্মা সেতু। ছিল অর্থনৈতিক বাধাও।

 

এ সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাংক কথিত দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলে। এরই ধারাবাহিকতায় মন্ত্রিসভা থেকে সরে যেতে হয় তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে। জেলে যেতে হয় সে সময়ের সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া ও প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সচিব কাজী মো. ফেরদৌসকে। পরবর্তী সময়ে কানাডার আদালতের মাধ্যমে প্রমাণ হয় অভিযোগটি ‘কাল্পনিক’ ছিল।

 

কথিত দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিলের ঠিক ১০ বছর পর পদ্মা সেতু চালু হতে যাচ্ছে। পদ্মা সেতু নির্মাণে ১২০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার চুক্তি ২০১২ সালের ২৯ জুন বাতিল করেছিল বিশ্বব্যাংক। ওই বছরের ৯ জুলাই সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনে নিজের টাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হবে। ঠিক ১০ বছরে তা করে দেখিয়েছে বাংলাদেশ।

 

তার আগে ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেতুর প্রাক সমীক্ষার প্রতিবেদন দেয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। ওই বছরের ৪ জুলাই পদ্মা সেতু নির্মাণে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী মূল সেতুর নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন। তবে তারও আগে ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর শুরু হয় প্রকল্পের অন্যান্য কাজ। অবশ্য এর আগে ৮ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা ব্যয় ধরে ২০০৫ সালের ১৯ অক্টোবর পদ্মা সেতুর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। তবে তখনকার বিএনপি সরকার তা অনুমোদন করেনি। তাতে কী? ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ২২ দিনের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এইকমকে নকশা তৈরির পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সেতুর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারে ওপর বসানো হয় প্রথম স্প্যান। এরপর ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর সেতুর শেষ স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে সেতুর পুরো অবয়ব ভেসে ওঠে। অবশ্য স্প্যান বসানোতেও প্রকৃতির বাধা ছিল।

 

শনিবার উদ্বোধন পর রোববার থেকে চলতে থাকবে গাড়ি। এর ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের যাত্রীদের আর যানজটের কবলে অসহায় অবস্থায় পড়তে হবে না। ঈদে-পার্বণে দুঃসাহসিক যাত্রায় জীবন বাজি রেখে যাত্রীদের আর বিশাল ও উত্তাল পদ্মা নদী পাড়ি দিতে হবে না। আবার নদী পাড়ি দিতে গিয়ে সলিল সমাধির মতো মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আর কোনো বাড়িতে কান্নার রোল উঠবে না। এতকাল যে নদীটি কোটি মানুষের অবাধ যাতায়াতের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হিসেবে বিদ্যমান ছিল, সেই পদ্মা নদীর উভয় তীরের মধ্যে একটি সহজ, নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ স্থাপিত হলো একটি সেতু নির্মাণের মাধ্যমে। পদ্মা সেতু নির্মাণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নদী নিজেই। নদীর তলদেশে নরম মাটি। এমন একটি নদীতে কাদার ওপর কীভাবে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ ও তাকে টিকিয়ে রাখা হবে, এটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেতু বিভাগের প্রতিবেদনে ১৩ চ্যালেঞ্জের কথা উঠে এসেছে। প্রকল্পের প্রকৌশলী এবং প্যানেল এক্সপার্টের প্রয়াত প্রধান অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজার বক্তব্য অনুযায়ী, পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতে নরম মাটির ওপর কীভাবে ১০০ বছরের স্থায়িত্বে সেতু নির্মাণ করা যায়- তার সমাধান এসেছিল বিস্তারিত নকশায়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এইকম নকশা তৈরি করে। ৫১ হাজারের বেশি কর্মী রয়েছে সংস্থাটির। পদ্মা সেতুর লিড ডিজাইনার ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক রবিন শ্যাম। তবে তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আরও অনেকেই। পদ্মা প্রকল্পের জটিল বিষয়াদি সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য প্রয়াত ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীসহ দেশ-বিদেশের মোট ১২ জন বরেণ্য প্রকৌশল ও আইন বিশেষজ্ঞ এর দায়িত্ব পালন করেন। ইতোমধ্যে ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, অধ্যাপক ড. আলমগীর মুজিবুল হক এবং অধ্যাপক ড. এএমএম শফিউল্লাহকে হারিয়েছি, যাদের অবদান চিরস্মরণীয়।

সেতুর জন্য শক্ত ভিত তৈরিতে প্রথমে ড্রেজার দিয়ে বালু সরিয়ে নদীতে ভারী পাথর, কংক্রিটের ব্যাগ এবং জিওব্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে। পাথরগুলো একেকটি ৮০০ থেকে হাজার কেজির। প্যানেল অব এক্সপার্ট সদস্য ড. আইনুন নিশাত জানালেন, ভিত তৈরির পর শুরু হয় পাইল বসানোর কাজ।

পদ্মা সেতুর পিলার (খুঁটি) তৈরিতে পরীক্ষামূলক পাইলিং শুরু হয় ২০১৫ সালের ১ মার্চ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ওই বছরের ১২ ডিসেম্বর। চীন থেকে সাগর পথে বাংলাদেশে আসে পাইলিং পাইপ বানানোর ইস্পাতের পাত। ৬০ মিলিমিটার বা ২ দশমিক ৩৬ ইঞ্চি পুরু ইস্পাতের পাতগুলো। একেকটির ওজন ১৩ টন। এসব ইস্পাতের পাতকে দানবীয় শক্তির বেন্ডিং মেশিন দিয়ে সিলিন্ডারের আকৃতি দেয়া হয়। ৩ দশমিক ২ মিটার বা ১০ ফুট ব্যাসের একেবারে নিখুঁত গোলাকার ২৫টি সিলিন্ডার একত্রে যোগ করে তৈরি এক একটি পাইল পাইপ। ৯৮ থেকে ১২৫ দশমিক ৪৬ মিটার দীর্ঘ ছিল পাইল পাইপ। এগুলো নদীর তলদেশে পোঁতার পর ভেতরে রড ও সিমেন্টের ঢালাই দিয়ে পিলারের ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে।

প™§ায় স্রোতের কারণে পাইল ড্রাইভিং বা পাইল বসানোও দুরূহ ছিল। প্রথমে নদীর তলদেশ পর্যন্ত পাইল গাইড বসানো হয়। এর মধ্য থেকে পানি সেচে ফেলে হয়। এরপর ক্রেন দিয়ে কিছু আনুভূমিকভাবে পাইলিং পাইপ পোঁতা শুরু হয় শক্তিশালী হাতুড়ি বা হাইড্রোলিক হ্যামার দিয়ে পিটিয়ে। তিনটি জার্মান ও দুটি ডাচ হাতুড়ি ছিল, সেগুলো প্রতি আঘাতের ক্ষমতা ছিল তিন হাজার কিলোজুল পর্যন্ত।

পাইল বসাতে গিয়েই সব বড় কারিগরি বাধায় পরে পদ্মা সেতু। নকশা অনুযায়ী প্রতিটি পিলারের নিচে ছয়টি করে পাইল বসানো হবে। নদীর তলদেশের ১২৮ মিটারে পাথরের স্তর পাওয়া যায়নি। নদীর বুকের ৪০ পিলারের মধ্যে ১৪টিতেই ছিল এ সমস্যা। এ কারণে দুই বছর এসব পিলারের কাজ আটকে ছিল।

নকশা সংশোধন করতে হয় প্রকল্পের মাঝপথে। তবে স্থায়িত্বের জন্য ২২ পিলারে একটি করে বাড়তি পাইল করতে হয় ছয় পাইলের মাঝখানে। মিহি সিমেন্ট ঢুকিয়ে পাইলের শেষ প্রান্তে পাথরের মতো শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করা হয় কৃত্রিমভাবে। বাকি ১৮ পিলারে ছয়টি করে পাইল করা হয়েছে। নদীর তীরের মাটিতে নির্মিত ১ ও ৪২ নম্বর পিলারে ১৬টি কংক্রিট পাইল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সেতুতে পাইলের সংখ্যা ২৯৪।

২০২১ সালের মার্চে সব পিলার তৈরি হয়। তখন বাধা হয়ে দাঁড়ায় ট্রাস নামে পরিচিতি পাওয়া স্প্যান জটিলতা। পদ্মা সেতু ইংরেজি ‘এস’ অক্ষরের মতো। এ কারণে সেতুর ৪১টি স্প্যান এবং দুই হাজার ৯১৭টি রোডওয়ে স্ল্যাবে ভিন্নতা রয়েছে। নির্দিষ্ট দুই পিলারের মাঝে স্থাপনের জন্য নির্মিত ট্রাস ও রোডওয়ে স্ল্যাব অন্য কোথাও স্থাপনের সুযোগও ছিল না। নদীর তলদেশের সমস্যায় পিলার নির্মাণে বিলম্বের কারণে নির্মিত ট্রাস ও রোডওয়ে স্ল্যাব নিয়ে কারিগরি সমস্যা পোহাতে হয়।

পদ্মার স্রোত শুধু সর্বনাশা নয়, আশীর্বাদও। এই স্রোতের কারণে পদ্মার ইলিশ দুনিয়াজুড়ে বিখ্যাত। ইলিশ বাংলাদেশের জিডিপির এক শতাংশ জোগান দেয়। সেতুতে নির্মাণকাজের কারণে ইলিশ পদ্মাবিমুখ হওয়ার আশঙ্কা ছিল। সে কারণেই পদ্মা নদীতে পিলারের সংখ্যা যমুনার তুলনায় কম, যেন স্রোত ব্যাহত না হয়। যাতে চর পড়ে নদী সঙ্কুুচিত না হয়। আইনুন নিশাত জানান, মাছের জন্য পাইলিংয়ের সময় শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। সবশেষে আবারও বলতে হয়, কোনো বৈদেশিক সাহায্য ছাড়াই বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তবায়িত সর্ববৃহৎ সড়ক ও রেলসেতু এই স্বপ্নের পদ্মা সেতু। সেতুটি নির্মাণের ফলে বার্ষিক ০.৮৪ শতাংশ দারিদ্র্য হ্রাস পাবে এবং জিডিপিতে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ অবদান রাখবে। দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলো থেকে ঢাকার দূরত্ব কমবে এবং যাতায়াতের সময়ও যথেষ্ট কমে যাবে। সেতুটি দক্ষিণাঞ্চলের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিল্প বিকাশে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। পর্যটনশিল্প হবে আরও সমৃদ্ধ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উদাহরণও হয়ে থাকবে এই সেতু।