আজ থেকে এলাকা ভিত্তিক লোডশেডিং

প্রকাশিত: ৪:৫৮ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৯, ২০২২

আজ থেকে এলাকা ভিত্তিক লোডশেডিং

 * তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্থগিত

* সপ্তাহে একদিন পেট্রোল পাম্প বন্ধ

* সরকারি-বেসরকারি অফিসের কিছু কার্যক্রম ভার্চুয়ালি হচ্ছে

* রাত ৮টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ

*এলাকাভিত্তিক সম্ভাব্য লোডশেডিংয়ের তালিকা ওয়েবসাইটে

 

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে আজ মঙ্গলবার থেকে শিডিউল অনুযায়ী এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং, তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্থগিত, সরকারি-বেসরকারি অফিসের কিছু কার্যক্রম ভার্চুয়ালি সম্পাদন এবং সপ্তাহে একদিন পেট্রোল পাম্প বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

 

 

গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।   এছাড়া বৈঠকের পর মন্ত্রণালয়ে বিদ্যুতের সার্বিক বিষয় নিয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এমপি।

 

 

তৌফিক এলাহী চৌধুরী বলেন, ধৈর্য্য সহকারে এই সংকট মোকাবেলা করতে হবে। সবাইকে নিজ উদ্যোগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। পৃথিবীর অনেক উন্নত রাষ্ট্র, যাদের অনেক টাকা পয়সা আছে, তারাও লোডশেডিংয়ে যাচ্ছে। ব্রিটেনে হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ায় হচ্ছে, জাপানে হচ্ছে। কোনো কোনো দেশে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও, ব্যাংকে অর্থ থাকা সত্ত্বেও সংবরণ করছে। আজকের আলোচনার একটা মুখ্য বিষয় হচ্ছে যে আমরা আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে আনব, যাতে আমাদের খরচ কম হয়।

 

 

এর অংশ হিসেবে ডিজেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্থগিত করার পাশাপাশি অন্যান্য খাতেও বিদ্যুতের ব্যয় কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা।

 

তৌফিক এলাহী চৌধুরী বলেন, সারাদেশে এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি হবে। এই ঘাটতি অঞ্চলভিত্তিক ভাগ করে নিতে হবে। তাতে দিনে এক থেকে দেড় ঘণ্টা, কোনো কোনো জায়গায় দুই ঘণ্টাও লোডশেডিং হতে পারে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবং পৃথিবীর এই দুর্যোগপূর্ণ সময় আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

 

 

তিনি বলেন, তখন আমরা ত্যাগের মানসিকতা নিয়ে অগ্রসর হয়েছিলাম। সেই যুদ্ধে আমরা বিজয় অর্জন করেছি বিধায় এই যুদ্ধ আমাদের জন্য তুলনামূলক সহজ। এই যুদ্ধে আপনারা সবাই অংশ নেবেন।

 

 

তিনি জানান, কীভাবে বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো যায় বৈঠকে তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। রাত ৮টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ করা, অফিসে কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা, প্রয়োজনে বাসা থেকে ভার্চুয়ালি অফিস করা, সরকারি গাড়িতে বেশি লোক পরিবহন করাসহ অন্যান্য বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

 

 

জ¦ালানি উপদেষ্টা বলেন, দোকানপাট শপিংমল বন্ধ থাকবে, এসিগুলো যেগুলো চলে, সেটা ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে হবে, কেউ যদি এসব আদেশ অমান্য করে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর হতে বাধ্য হব। “আমরা হয়তো কারপুলিং শুরু করব যাতে দুই-তিনজন মিলে এক গাড়িতে আসতে পারি অফিসে। সরকারি সভাগুলো কমিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয় করব, সভাগুলো অনলাইনে করার চেষ্টা করব।”

 

 

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, মঙ্গলবার  সন্ধ্যার পর থেকে এক সপ্তাহ জোনভিত্তিক একঘণ্টা করে লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে এতে যদি সাশ্রয় কম হয়, তাহলে আরও এক ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। সাশ্রয়ের জন্য ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখা হবে। এছাড়া রাত ৮টার পর শপিং মলসহ দোকানপাট বন্ধ রাখা, উপাসনালয়ে প্রার্থনার সময় ছাড়া এসি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হবার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

 

 

তিনি বলেন, রাত ৮টা থেকে কোনোরকম দোকানপাট, শপিংমল, আলোকসজ্জা-সব বন্ধ থাকবে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ বিভাগকে বলা হয়েছে, তারা খুব কঠিনভাবে এ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবেন। যদি কেউ অমান্য করেন তাদের বিদ্যুতের লাইন আমরা বিচ্ছিন্ন করে দেবো।

 

 

প্রতিমন্ত্রী বলেন, অফিস সময়ের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এটা নিয়ে এখনো পুরোপুরি সিদ্ধান্ত হয়নি। এটা নোটিশ আকারে যাবে।

 

 

জ্বালানি তেল সাশ্রয়ের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা যদি যানবাহনগুলো খুব হিসাব করে ব্যবহার করি, আমাদের সরকারি মিটিং যতগুলো হয়, আমাদের মন্ত্রণালয়ে বা অন্য অফিসে হয়, সেগুলো যদি আমরা অনলাইন করে ফেলি। এরই মধ্যে আমরা এতে অভ্যস্ত। গত দুই বছর তো আমরা করেছি। এতে আমাদের বাহনে অনেকখানি (জ্বালানি তেল) সাশ্রয় হবে।

 

 

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে রাত ৮টার পর সারাদেশে দোকান, বিপণি-বিতান, মার্কেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার পর গত ১৯ জুন এ সিদ্ধান্ত নেয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, যা ২০ জুন থেকে কার্যকর হয়।

 

 

প্রধানমন্ত্রীর অফিসে বৈঠকের পর মসজিদে এসি বন্ধের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী উপাসনালয়ে এসি বন্ধের বিষয়ে বলেন, ‘শুধু মসজিদ নয়, উপাসনালয়ে (মসজিদ, মন্দির ও গির্জা) সবখানে প্রচুর এসি লাগানো হয়েছে। প্রার্থনার সময় বা নামাযের সময় তারা যেন মিতব্যয়ী হয়ে এসিটি চালান। প্রার্থনা শেষ হলে তারা যেন এসি সময় মতো বন্ধ করেন, আমার সাজেশন এটাই থাকবে। আমাদের এভাবে আলোচনা হয়েছে।’

 

 

নসরুল হামিদ বলেন, ‘পেট্রোল পাম্প সপ্তাহে একদিন বন্ধ রাখার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। বিপিসি পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে বসে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে।’

 

 

বিশ্বে জ্বালানি সংকটের কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ নানা রকম সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করেছে। কিছু কিছু দেশ দাম বৃদ্ধি করেছে। কেউ কেউ সাশ্রয়ী নীতি নিয়েছে।

 

 

তিনি বলেন, ‘দেশে যে পরিমাণ ডিজেল আমদানি হয়, তার ১০ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার হয়। আর বাকি ৯০ ভাগ ব্যবহার হয় অন্য খাতে। এখন যদি আমরা ১০ ভাগ বিদ্যুতে বন্ধ করার পর অন্য খাত থেকে আরও ১০ ভাগ বাঁচাতে পারি, তাহলে আমাদের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।’

 

 

ডিজেলের বিদ্যুতের দামের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এখন ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪০ টাকা। কিন্তু আমরা বিক্রি করে এই অর্থ পাচ্ছি না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এখন গ্যাস প্রতি এমএমবিটিইউ ৩৯ ডলারে কিনে এনে ৭ টাকায় বিক্রি করছি।’

 

 

কোথায় কখন লোডশেডিং হবে এ তথ্য কীভাবে জানা যাবে- জানতে চাইলে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বিকাশ দেওয়ান বলেন, ‘এলাকাভিত্তিক সম্ভাব্য লোডশেডিংয়ের তালিকা করে ওয়েবসাইটে আপলোড করে দেয়া হচ্ছে। গ্রাহকরা ওয়েবসাইটে গেলেই সেখানে একটি লিংক পাবেন, সেখানে ক্লিক করে তাদের এলাকার সম্ভাব্য লোডশেডিংয়ের সময় জানতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের বৈঠকে দেশের সব বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিকে এ ধরনের তালিকা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

 

 

গ্রাহকরা এ তথ্য কীভাবে পাবেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিগগিরই পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ওয়েবসাইট ও লিংক প্রকাশ করা হবে।’ পরে শনিবার দুপুর দেড়টার দিকে ডিপিডিসির ওয়েবসাইটে গিয়ে এ সংক্রান্ত একটি লিংক পাওয়া যায়। বিভিন্ন বিদ্যুৎ কোম্পানির ওয়েবসাইটে দেয়া এমন লিংকেই লোডশেডিংয়ের তথ্য পাওয়া যাবে।